Goodman Travels

পাবনায় মুক্তিযোদ্ধা কন্যাকে পুড়িয়ে হত্যার নেপথ্যে: প্রতিহিংসা

সরেজমিন প্রতিবেদন:পাবনার সাঁথিয়া উপজেলার নাগডেমড়া গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা মোজাম্মেল হকের কলেজ পড়–য়া মেয়েকে পুড়িয়ে হত্যার ৫দিন পরেও  বাড়িতে কান্নার রোল থামেনি। মুক্তিযোদ্ধা কন্যা পাবনা এডওয়ার্ড কলেজের দর্শন বিভাগের (অনার্স) ২য় বর্ষের ছাত্রী মুক্তি খাতুনকে (২২) পিতার প্রতিপক্ষের সন্ত্রাসীরা গায়ে পেট্রোল ঢেলে পুড়িয়ে মারায় ওই বাড়িতে চলছে শোকের মাতম। এখনও বাড়িতে ও বাড়ির আশে পাশে প্রচুর লোক সমাগম। দীর্ঘ ১৩ দিনেও মামলার প্রধান আসামী সালাম গ্রেপ্তার না হওয়ায় এলাকায় নানা মুখী গুঞ্জন চলছে। এলাকায় পুলিশ মোতায়েন রয়েছে।
গত শনিবার সরেজমিন মোজাম্মেল হকের বাড়িতে গেলে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন স্বজনেরা। কান্না জড়িত কন্ঠে মুক্তির বড় বোন বেলী খাতুন বলেন, ওরা অসময়ে আমার বোনকে পুড়িয়ে মেরে দুনিয়া ছাড়া করলো। মুক্তি খালা রোজিনা বলেন, জেলে, মিনি, চম্পা ও শাকের মিলে বাড়িতে ঢুকে মুক্তির গায়ে পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়। সরেজমিন এ ঘটনার পিছনে দুটি কারণ বেড়িয়ে আসে। ১ম কারণ রাজনৈতিক প্রতিহিংসা। ২য় কারণ পাউবো’র জলাশয় দখল। মুক্তির পিতা মুক্তিযোদ্ধা মোজাম্মেল হক বলেন, আমার মেয়ে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার। আমার বংশ আজীবন বঙ্গবন্ধুর আদর্শের ও জননেত্রী শেখ হাসিনার ভক্ত আওয়ামী লীগ পরিবার। ২০১৪ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আমি নাগডেমড়া নির্বাচন কেন্দ্রে  আ’লীগ নেতা সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী অধ্যাপক আবু সাইয়িদের নির্বাচনী এজেন্ট ছিলাম। তখন থেকেই নাগডেমড়া গ্রামের বাসিন্দা নাগডেমড়া ইউনিয়ন ১নং ওয়ার্ড আ’লীগ সভাপতি  আব্দুস সালাম আমাকে টার্গেট করে। সালাম একজন সুবিধাবাদী চরিত্রের লোক। যখন যে দল ক্ষমতায় থাকে সে তার ভোল বদলিয়ে ওই দলে যোগ দেয়। সে একজন হাইব্রিড আওয়ামী লীগ। এর সাথে একমত পোষণ করে নাগডেমড়া ই্উনিয়ন ১ নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য রমজান আলী জানান,  ছালাম প্রথমে জাতীয় পার্টি করে। পরবর্তিতে বিএনপি  এবং ২০০১ সালে জামায়াত রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত হয়। রাজনৈতিক সুবিধা নিতে ২০০৮ সালে সে আ’লীগে যোগ দিয়ে নাগডেমড়া ইউনিয়ন আ’লীগের ১নং ওয়ার্ড সভাপতি হয়। নজরুল ইসলামের ছেলে সালামের চাচাতো ভাই আপন বলেন, সালাম একজন ধান্দাবাজ, ক্ষমতা লোভী। গ্রামের সব কাজে সে তার দাপট দেখায়। রাজনৈতিক ভাবে সুবিধা আদায় করা তার চরিত্রের প্রধান বৈশিষ্ট্য। সে নানা অনৈতিক কাজের হোতা। তার অনৈতিক কাজে সহযোগিতা না করায় তার দল আমাদের বাড়িঘরে ভাংচুর ও লুটপাট চালায়। মুক্তিযোদ্ধা মোজাম্মেলকে সে রাজনৈতিক শত্রু মনে করে।
নাগডেমরা ইউনিয়ন চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হারুন-অর রশিদ ডেইলি পাবনা ডটকমকে বলেন আমি শুনেছি আঃ সালাম আওয়ামী লীগের অনুপ্রবেশকারী।
২য় কারণ হিসেবে স্থানীয়রা জানান, নাগডেমরা গ্রামের পানি উন্নয়ন বোর্ডের জলাশয় দখলকে কেন্দ্র করে দু’গ্রুপের মধ্যে বেশ কিছুদিন ধরে বিরোধ চলে আসছিল। ওই জলাশয়টি প্রথমে মোজাম্মেল হক গ্রুপের লোকজনের দখলে ছিল। এটি দখলে নিতে যায় ছালাম গ্রুপের লোকজন। এ নিয়ে দু’গ্রুপের বিরোধের সূত্রপাত। এই বিরোধের জেরে গত ২৮ ও ২৯ জুলাই দু’গ্রুপ এক অপরের বাড়িতে হামলা চালায়। এ নিয়ে উভয় গ্রুপের দু’টি মামলা হয়। এই হামলায় মুক্তিযোদ্ধা মোজাম্মেলের বাড়িতে ব্যাপক লুটপাট করে ছালাম গ্রুপ। লুটপাটের পর ছালাম গ্রুপের ভয়ে মোজাম্মেল পরিবার গ্রাম ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়। মুক্তিযোদ্ধা মোজাম্মেল জানান, ১২ আগস্ট সাঁথিয়া থানার ওসি (তদন্ত) আঃ মজিদ ও নাগডেমরা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হারুন অর রশিদ কোন অসুবিধা হবে না মর্মে আমাকে আশ্বস্ত করে বাড়িতে রেখে যান। বাড়িতে রেখে যাওয়ার পর ছালাম গ্রুপ আমাকে হত্যার হুমকি দিলে আমি থানায় জিডি করি। এতে রাগান্নিত হয়ে ছালাম গ্রুপ দেশীয় অস্ত্র নিয়ে ১৯ আগস্ট ৩০-৪০ জনের একটি দল আমার বাড়িতে হামলা চালায়। ওরা আমাকে ও আমার ছেলেদের খুঁজতে থাকে। প্রান ভয়ে আমরা বড়াল নদী সাঁতরিয়ে ওপাড়ে চলে যাই। হামলাকারিরা বাড়িতে কোন পুরুষ না পেয়ে রাজনেতিক প্রতিহিংসার ঝাল মেটাতে আমার কলেজ পড়–য়া মেয়ে মুক্তির  গায়ে পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়।  গুরুতর আহত মুক্তিকে স্থানীয়রা উদ্ধার করে প্রথমে সাঁথিয়া হাসপাতালে ও পরে ওই দিনই ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ণ ইউনিটে ভর্তি করা হয়। ৯ দিন মৃত্যুর সাথে লড়াই করে ২৭ আগস্ট দিবাগত রাত সাড়ে ১২টায় মুক্তি শেষ নি:শ্বাস ত্যাগ করে। এদিকে ছালামের বাড়িতে গিয়ে তার বৃদ্ধ শয্যাষয়ী পিতা ও বৃদ্ধা মাতাকে পাওয়া যায়। ছালামের মা জহুরা খাতুন সাংবাদিকদের জানান, ওই মেয়ের ক্যান্সার ছিল। আমার ছেলেদের ফাঁসনোর জন্য মোজাম্মেল নিজেই ওর মেয়েকে পুড়িয়ে মেরেছে। ও আর মুসলমান নাই, হিন্দু হয়া গ্যাছে। মুক্তিযোদ্ধার বাড়িতে হামলার পর থেকে এখন পর্যন্ত ঘটনা স্থলে পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। হামলার ১৩ দিন ও কলেজ ছাত্রী মুক্তির মৃত্যুর ৫ দিন অতিবাহিত হলেও পুলিশ এখনও মামলার প্রধান আসামী সালাম ও জাহিদ ডাক্তারকে আটক করতে না পারায় এলাকায় রয়েছে নানা গুঞ্জন।

দীর্ঘ ১৩ দিনেও এজাহার ভুক্ত মামলার প্রধান আসামী সালাম গ্রেপ্তার না হওয়ায় এলাকায় নানা মুখী গুঞ্জন চলছে।
এ বিষয়ে সাঁথিয়া থানার ওসি তদন্ত আঃ মজিদ ডেইলি পাবনা ডটকমকে বলেন এ পর্যন্ত ২৪ জনকে আটক করা হয়েছে। এলাকায় পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। অন্যদেরও আটকের চেষ্টা চলছে।