Goodman Travels

ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন রনি’র

পলিটেকনিকের মেধাবী ছাত্র তরিকুল ইসলাম রনি

পাবনা প্রতিনিধি: একটি পা নিয়েই প্রায় সাত বছর ধরে লেখাপড়ায় সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন পাবনার চাটমোহর পলিটেকনিকের মেধাবী ছাত্র তরিকুল ইসলাম রনি।

একটি পায়ের অভাবে রনির জীবন অস্বাভাবিক। একটি সড়ক দুর্ঘটনা থামিয়ে দিয়েছে তার স্বাভাবিক জীবনের ছন্দ। তিনি আর দশটা ছেলের মতো স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা বা খেলাধুলা করতে পারেন না। বাড়িতে যতক্ষণ থাকেন, এক পায়ে লাফিয়ে লাফিয়ে চলতে হয় তাকে। এক পায়েই বাই সাইকেল চালিয়ে প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে প্রতিদিন কলেজে যাতায়াত করেন। প্রতিদিনই ২০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হয়।

পঙ্গুত্ব বা দারিদ্র দমাতে পারেনি রনিকে। স্বপ্ন তার প্রকৌশলী হওয়ার। সব কষ্টকে মাড়িয়ে এক পায়ে ঘুরে দাঁড়ানোর এই অদম্য চেষ্টা দেখে মুগ্ধ হচ্ছে মানুষ।

চাটমোহরের হরিপুর ইউনিয়নের মুশাগাড়ি পশ্চিমপাড়া গ্রামের মো: মুন্নাফ হোসেন ও চম্পা খাতুন দম্পতির সন্তান তিনি। এক ভাই ও এক বোনের মধ্যে রনি বড়। ছোট বোন রানী চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ে।

এ বছর চড়ইকোল উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এ মাইনাস গ্রেডে এসএসসি পাস করে চাটমোহর পলিটেকনিক এন্ড টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং ইন্সটিটিউটে প্রথম বর্ষে ভর্তি হয়েছেন রনি।

আলাপকালে রনি জানান, ২০১২ সালে চড়ইকোল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পঞ্চম শ্রেণিতে পড়া অবস্থায় একদিন চাচার সাথে মোটরসাইকেলে পাবনা শহরে যান তিনি। ফেরার পথে সন্ধ্যার দিকে শ্যালোইঞ্জিন চালিত ভুটভুটি সামনে থেকে তাদের মোটর সাইকেলকে ধাক্কা দিলে গুরুতর আহত হন রনি। ঢাকার পঙ্গু হাসপাতালে ভর্তির পর তার ডান পা হাঁটুর ওপর থেকে কেটে ফেলতে হয়। তারপর সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরলেও পা হারানোর বেদনা হয়ে ওঠে ভীষণ হতাশার। এক পা নিয়ে কিভাবে চলবেন, আর কিভাবেই বা করবেন লেখাপড়া- মনে ঘুরপাক খেতে থাকে এমন নানা ভাবনা।

কিন্তু হাল ছাড়েননি তিনি। মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেন এক পা নিয়েই সংগ্রাম চালানোর। তারপর থেকে শুরু। এসএসসি পাস করে তিনি এখন কলেজ শিক্ষার্থী। তবে বন্ধুদের সাথে ঘুরতে বা খেলতে না পারার আক্ষেপটা তাকে খুব পীড়া দেয়।

তরিকুল ইসলাম রনি বলেন, ‘বর্তমানে তো অনেক পঙ্গু ও প্রতিবন্ধী মানুষ সমাজে ভাল কিছু করছে, সরকারি চাকরিও করছে। তাই পড়ালেখাটা ছাড়ি নাই, ইচ্ছাশক্তি ছিল আমি পারবো। তাই চেষ্টা করে যাচ্ছি। পড়ালেখা করে ভবিষ্যতে প্রকৌশলি হতে চাই। পড়ালেখা শেষ করে একটা চাকরির ব্যবস্থা হলে এক পা না থাকার কষ্টটা ভুলতে পারবো।’

রনি বলেন, ‘এক পায়ে সাইকেল চালিয়ে কলেজে যাওয়া-আসা করতে খুব কষ্ট হয়। একটা আর্টিফিসিয়াল পা হলে আমি নিজের পায়ে দাঁড়াতে ও হাঁটতে পারবো। কিন্তু কেনার সামর্থ্য নেই আমাদের। সেইসাথে একটি ব্যাটারি চালিত সাইকেল হলে কলেজে যাতায়াত আমার জন্য সহজ হতো।’

রনির বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, একটি ইটের ঘর। বাড়ির জায়গা ছাড়া জমিজমা তেমন নেই। বাবা মুন্নাফ হোসেনের এক চোখ নেই। রাস্তার সাথে বাড়ির একটি কক্ষে ছোট্ট মুদিখানা দোকান ও চা বিক্রি করে চলে চারজনের সংসার। সবমিলিয়ে ছেলে-মেয়ের লেখাপড়া চালানোই দুরুহ তাদের।

বাবা মুন্নাফ হোসেন বলেন, ‘রনি যে কষ্ট করছে, সে যেন মানুষ হতে পারে। সমাজে মাথা উঁচু করে বাঁচতে পারে, একটা চাকরিকরে জীবনটা কাটাতে পারে সেই আশা করি।’

কান্নাজড়িত কন্ঠে মা চম্পা খাতুন বলেন, ‘ছেলের জন্য দোয়া করি সে যেন সমাজে ভাল দাম পায়। ছেলেটা পঙ্গু, এক পা নেই, কেউ যেন তাকে অবহেলা না করে। একটি প্রতিবন্ধী কার্ডের জন্য স্থানীয় মেম্বারের কাছে ধর্ণা দিয়েও কাজ হয়নি। প্রতিবন্ধী ভাতা পেলে উপকার হতো।’

এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে চাটমোহর উপজেলা নির্বাহী অফিসার সরকার অসীম কুমার বলেন, ‘অদম্য শিক্ষার্থী রনি ও তার পরিবারের পাশে দাঁড়াবে উপজেলা প্রশাসন। রনিকে আর্টিফিসিয়াল পা ও ব্যাটারি চালিত বাইসাইকেল দেয়ার ব্যবস্থা করা হবে। সেইসাথে তার প্রতিবন্ধী ভাতার কার্ড করে দেয়ার ব্যবস্থাও গ্রহণ করবে উপজেলা প্রশাসন।’

-রাইজিংবিডি