পাবনাবাসীর দীর্ঘশ্বাস মৃতপ্রায় ইছামতী নদী

পাবনার ইতিহাস ঐতিহ্য

ডেস্ক রিপোর্ট : অয়ি তন্বী ইছামতী, তব তীরে তীরে/শান্তি চিরকাল থাক্ কুটিরে কুটিরে-/শস্যে পূর্ণ হোক ক্ষেত্র তব তটদেশে/বর্ষে বর্ষে বরষায় আনন্দিত বেশে। খর¯্রােতা ইছামতীর রূপে বিমুগ্ধ কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এভাবেই চৈতালী কাব্য গ্রন্থে ইছামতী কবিতায় বলেছেন তার প্রত্যাশার কথা। তবে, সময়ের ব্যবধানে সেই দুরন্ত যৌবনা ইছামতি দখল দূষণে আবর্জনার ভাগাড়ে পরিণত হবে তা হয়তো কল্পনায় ছিলনা করোই।
উত্তরবঙ্গের প্রাচীন জেলা শহর পাবনার বুক চিরে প্রবাহিত খরস্রোতা ইছামতি নদী এখন শুধুই স্মৃতি। প্রভাবশালীরা নদী দখল করে গড়েছেন পাকা স্থাপনা। ময়লা আবর্জনায়, পানি প্রবাহ বন্ধ হয়ে দূষিত হচ্ছে পরিবেশ। সামাজিক আন্দোলন,আইনী পদক্ষেপ কোন কিছুতেই প্রতিকার না পেয়ে এখন হতাশ পাবনাবাসী।
পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ও ইতিহাসবিদ ড. আব্দুল আলীম জানান, ১৬০৮ সালে বাংলার সুবেদার ইসলাম খাঁর শাসনামলে সৈন্য পরিচালনার সুবিধার্থে পদ্মা ও যমুনা নদীর সংযোগ স্থাপনে একটি খাল খনন করা হয়। এই খালই পরে ইছামতি নাম ধারণ করে। এ নদীকে ঘিরেই গড়ে ওঠে পাবনা শহর। আর এই ইছামতি দিয়েই কুষ্টিয়ার শিলাইদহ কুঠিবাড়ী থেকে শাহজাদপুরের কাচারি বাড়িতে যাতায়াত করতেন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। কবির লেখা একাধিক কবিতা,গল্পে এসেছে এ নদীর নাম।
জেলা শহরের প্রবীণ ব্যক্তিদের সাথে কথা বলে জানা যায়, ১৯৭০ এর দশকে পাবনা পৌর এলাকার প্রায় আট কিলোমিটার এলাকায় ছিল ইছামতীর বিস্তার, প্রস্থ ছিল ৯০ থেকে ২০০ ফুট। অথচ, অব্যাহত দখলে নদীর প্রস্থ কমে এখন দাঁড়িয়েছে ২৫ থেকে ৩০ ফুটে। সংস্কারের অভাবে অধিকাংশ এলাকা ময়লা আবর্জনায় ভরাট হয়ে গেছে। সরকারী বেসরকারী পৃষ্ঠপোষকতায় দখল হয়েছে নদীর দুই তীর। প্রভাবশালীরা উৎসমুখ ভরাট করে ফেলায় ইছামতী এখন প্রাণহীন বদ্ধ খাল।


সরেজমিনে পাবনা পৌর এলাকায় ইছামতী নদী ঘুরে দেখা যায়, নদী দখল করে কেউ গড়েছেন পাকা স্থাপনা। বদ্ধ জলাশয়ের দূষিত আর নোংরা পানি পরিণত হয়েছে মশার প্রজনন ক্ষেত্রে।
ইছামতী বাঁচাও আন্দোলনের আহবায়ক ফারুক হোসেন চৌধুরী বলেন, ইছামতীর দখল দূষণের কারণে শহরের সৌন্দর্য্যই নষ্ট হয়ে গেছে। বার বার নদী খননে উদ্যোগের কথা শোনা গেলেও অদৃশ্য কারণে তা থেমে যায়। বিএনপি, আওয়ামীলীগ, তত্ত্বাবধায়ক সরকার সবাই কেবল আশ্বাস দিয়েছেন। আশ্বাসের বাস্তবায়ন এখনো হয় নি।
সরকারী ও বেসরকারী উদ্যোগে একাধিকবার নদী খননে উদ্যোগের কথা শোনা গেলেও তার কোন বাস্তব পদক্ষেপ দেখা যায়নি। সামাজিক আন্দোলনে উঠেছে দাবী, নদী উদ্ধারে ব্যবস্থা নিতে ২০১৭ সালে সংশ্লিষ্ট সকলকে আইনী নোটিশ দিয়েছে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনজীবী সমিতিও। এতেও কাজ না হওয়ায়, প্রশ্ন উঠেছে, কর্তৃপক্ষের সদিচ্ছা নিয়েই।
পাবনা প্রেসক্লাবের সাবেক সম্পাদক উৎপল মির্জা বলেন, নদীর দুই পাড়ের অনেক বাসিন্দা নদী দখল করে স্থায়ী স্থাপনা গড়ে তুলেছেন। এদের অনেকেই সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী হওয়ায় ইছামতীর বেহাল দশা দূর করা সম্ভব হচ্ছে না। নদী অবৈধ দখলমুক্ত করে, পুণঃখননের কাজে সেনাবাহিনীকে সম্পৃক্ত করারও দাবি জানান তিনি।
তবে, কর্তৃপক্ষ বলছেন, নদী খননে শুরু হয়েছে প্রকল্প প্রণয়ন। অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদে শীঘ্রই মাঠে নামবে প্রশাসন। পানি উন্নয়ন বোর্ড, পাবনা বিভাগীয় অঞ্চলের নির্বাহী প্রকৌশলী কে এম জহুরুল হক জানান, ইছামতী নদী পুনঃখননে আমাদের সদিচ্ছার কোন অভাব নেই। পানি উন্নয়ন বোর্ডের বিশেষজ্ঞ দল বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ^বিদ্যালয়ের বিশেষজ্ঞ দলের সহযোগীতায় সম্প্রতি ইছামতী নদী দখলমুক্ত করে পানি প্রবাহ সচল প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই (ভিসিবিলিটি স্টাডি) সম্পন্ন হয়েছে। প্রকল্প প্রণয়ন সম্পন্ন হলে নদী খননের কাজ শুরু হবে।
পাবনা জেলা প্রশাসক জসিম উদ্দিন বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশের সকল নদী উদ্ধারে নির্দেশনা দিয়েছেন। আমরা অবৈধ দখলদারদের চিহ্নিত করেছি,অচিরেই নদী কমিশন ও পানি উন্নয়নকে সাথে নিয়ে,অভিযান পরিচালনা করা হবে।
স্থানীয়রা জানান, গত চার দশকে জাতীয় সংসদ ও স্থানীয় সরকারের প্রতিটি নির্বাচনেই প্রার্থীদের অঙ্গীকার ছিল মৃতপ্রায় এ নদীকে দখল মুক্ত করে পানি প্রবাহ সচলের। হচ্ছে হবের হাঁক ডাকে সে সব প্রতিশ্রুতি আলোর মুখ দেখেনি আজও। আক্ষেপ আর দীর্ঘশ্বাসের এ নদীকে ঘিরে তাই পাবনাবাসীর প্রশ্ন, ইছামতীর প্রাণ ফিরবে কবে? । (দেশ রুপান্তর)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *