Goodman Travels

মুক্তিযুদ্ধের অগ্রনায়ক প্রয়াত বীরমুক্তিযোদ্ধা রফিকুল ইসলাম বকুল

নিজস্ব প্রতিবেদক: আজ পাবনার একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের অগ্রনায়ক, দক্ষ-সংগঠক ও বীর মুক্তিযোদ্ধা রফিকুল ইসলাম বকুলের আঠারোতোম মৃত্যুবার্ষিকী। ২০০০ সালের ১০ নভেম্বর আজকের এই দিনে ঢাকা থেকে পাবনা ফেরার পথে বঙ্গবন্ধু সেতু পশ্চিমপাড়ে সিরাজগঞ্জের কোনাবাড়ি নামক স্থানে এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় রফিকুল ইসলাম বকুল মৃত্যুবরণ করেন।

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের অগ্রনায়ক, সাবেক সংসদ সদস্য ও পাবনার জননন্দিত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব রফিকুল ইসলাম বকুল ১৯৪৯ সালের ২৯ জুন পাবনা শহরের দিলালপুর মহল্লায় মাতুলালয়ে জন্মগ্রহণ করেন। সিরাজগঞ্জ জেলার শাহজাদপুর উপজেলার চিথলিয়া গ্রামে তাঁর পৈতৃক নিবাস। নজিবর রহমান তাঁর পিতা ও রাবেয়া খাতুন তাঁর মাতা ।

রফিকুল ইসলাম বকুলের লেখাপড়ার হাতেখড়ি পাবনার মহাকালী (বর্তমান টাউন গার্লস স্কুল) পাঠশালায়। তিনি পাবনা জিলা স্কুল থেকে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা গ্রহণ করেন এবং ১৯৬৭ সালে এসএসসি পাস করেন। এডওয়ার্ড কলেজ, পাবনা থেকে এইচএসসি এবং শহীদ সরকারি বুলবুল কলেজ, পাবনা থেকে ১৯৭৪ সালে বিএ পাস করেন তিনি।

ফুটবল, ভলিবল, হকি, বাস্কেট, মুষ্টিযুদ্ধ, কাবাডিসহ প্রতিটি খেলায় দারুণ নৈপুণ্যের ছাপ রেখে গেছেন বীরমুক্তিযোদ্ধা রফিকুল ইসলাম বকুল। নাট্যাঙ্গনেও তিনি রেখেছেন উজ্জ্বল প্রতিভার স্বাক্ষর। নিয়মিত শরীরচর্চা করতেন তিনি। ১৯৬৬-৬৭ সালে এডওয়ার্ড কলেজ ছাত্র-সংসদের তিনি ছিলেন ব্যায়ামাগার সম্পাদক। ১৯৬৮ সালে পূর্ব পাকিস্তান বডিবিল্ডিং প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে বিশেষ কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখেন। এডওয়ার্ড কলেজে অধ্যয়নকালে তিনি সক্রিয় রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন এবং কলেজ শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।

১৯৭১ সালের ২৩ মার্চ পাবনা টাউন হল ময়দানে হাজার হাজার ছাত্র-জনতার সামনে টাউন হলের ছাদে পাকিস্তানি পতাকা ছিঁড়ে রফিকুল ইসলাম বকুল পাবনায় প্রথম বাংলাদেশের স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলন করেন এবং পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। মুক্তিযুদ্ধে তিনি বৃহত্তর পাবনা (পাবনা-সিরাজগঞ্জ) অঞ্চলের মুক্তিবাহিনী ও মুজিব বাহিনীর প্রধানের দায়িত্ব পালন করেন। মুক্তিযুদ্ধে তাঁর নেতৃত্ব ছিল অসাধারণ। একদিকে পাবনার মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত করা, অন্যদিকে মুক্তিযুদ্ধের সার্বিক পরিকল্পনা প্রণয়ন করা। ভারতে পাবনার যোদ্ধাদের থাকার জন্য ক্যাম্পের ব্যবস্থা করা। প্রশিক্ষণ শেষে পাবনাতে পাঠানোর ব্যবস্থা করা। কে কোন এলাকায় কী দায়িত্ব পালন করবে তা নির্ধারণ করা। বিশেষ বিশেষ যুদ্ধে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সরাসরি নিজে নেতৃত্ব দেয়া। অস্ত্র, টাকা-পয়সা যোগাড় করে পাবনায় এসে মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে পৌঁছে দেয়া। সব থানায় নিজে গিয়ে পরিস্থিতি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত দেয়া, নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করা।

কেচুয়াডাঙ্গা ক্যাম্পের বিভিন্ন সমস্যা সমাধান করা। মুজিবনগর সরকারের সঙ্গে এবং ভারত সরকারের প্রতিনিধিদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করা। মুজিব বাহিনীর নেতা তোফায়েল আহমেদের সঙ্গে এবং ব্যারাকপুর সেনানিবাসে যোগাযোগ রক্ষা করা। এক কথায় পাবনার মুক্তিযুদ্ধ সংশ্লিষ্ট সব বিষয় সুনিপুণভাবে নিয়ন্ত্রণ করতেন রফিকুল ইসলাম বকুল।

১৯৭২ সালে তিনি বৃহত্তর পাবনা জেলা শ্রমিক লীগের সভাপতি, ১৯৭৩ সালে পাবনা জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এবং ১৯৭৮ সালে তিনি জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৭৪ সালে একটি ষড়যন্ত্রমূলক মামলায় তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে নিহত হলে তাঁর ওপর সামরিক সরকার কর্তৃক হুলিয়া জারি করা হয়। ১৯৭৯ সালে তিনি ওই হুলিয়া থেকে মুক্ত হন।

১৯৮০ সালের ৩ নভেম্বর হরতালে আবদুল হামিদ সড়কে মিছিলের ওপর পুলিশ ও সামরিক বাহিনীর সদস্যরা হামলা করলে তিনি মারাত্মকভাবে আহত হন এবং কিছুদিন পর সামরিক সরকার তাঁকে গ্রেফতার করে। ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ সামরিক সরকারের নির্দেশে তাঁকে বন্দি করা হয় এবং তাঁর ওপর অমানুষিক শারীরিক নির্যাতন চালানো হয়। সামরিক আদালতে তাঁর বিরুদ্ধে আনিত অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় তিনি নিঃশর্ত মুক্তি পান। নব্বইয়ের স্বৈরাচার-বিরোধী আন্দোলনে তিনি জোরালো ভূমিকা পালন করেন।

রফিকুল ইসলাম বকুল ১৯৮৬ সালে চতুর্থ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পাবনা সদর আসন থেকে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে বিপুল ভোটে জয়লাভ করেন। ১৯৯৩ সালের ৩০ জানুয়ারি পাবনা জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের পদ থেকে পদত্যাগ করেন এবং ১৮ ফেব্রুয়ারি তাঁর বিপুল সংখ্যক সমর্থক নিয়ে বিএনপিতে যোগ দেন। ১৯৯৬ সালে ষষ্ঠ ও সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি বিএনপির প্রার্থী হিসেবে পাবনা সদর আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এরপর তিনি পাবনা জেলা বিএনপির সভাপতি নির্বাচিত হন এবং আমৃত্যু সে পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন।

রফিকুল ইসলাম বকুল ছিলেন অসাম্প্রদায়িক চেতনায় বিশ্বাসী একজন মানুষ। তিনি সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরের চিথলিয়া গ্রামে একটি মাজারে খাদেমের দায়িত্বও পালন করতেন। তাঁর আয়োজনে ১৯৮২ সাল থেকে সেখানে পবিত্র ওরশ শরিফ অনুষ্ঠিত হতো। শাহজাদপুরের খাজাবাবা এনায়েতপুরীর ভাবশিষ্য ছিলেন তিনি। ১৯৭৫ থেকে ১৯৭৯ সাল পর্যন্ত তিনি এক নাগাড়ে ৫ বছর রোজা রেখেছেন।

পাবনার সকল শ্রেণির মানুষের প্রিয় ব্যক্তি ছিলেন তিনি। কর্মীর প্রতি তাঁর সুদৃষ্টি সব সময় ছিল। নিজের ঘরে বাজারের খোঁজ না করলেও কর্মীদের বাসার খবর নিতেন সব সময়। কর্মীদের ভালোবাসতেন নিজের সন্তানের মতো, ভাইয়ের মতো।